🇺🇬 Uganda · The Cranes
উগান্ডা ভ্রমণ: নীল নদের উৎসে ফুটবল আর বৃষ্টি অরণ্যের প্রতিধ্বনি শোনা
কাম্পালার স্ট্রিট ফুটবল থেকে বিন্ডি রূপালি-পিঠ গরিলা
উগান্ডা ভ্রমণের প্রথম শব্দ জলপ্রপাত নয়, বৃষ্টি অরণ্যও নয়—কাম্পালার রাতের অন্ধকারে এক পাশ কাটানো শট। বল লাল মাটির রাস্তা থেকে লাফিয়ে উঠে বোদা-বোদা মোটরবাইকের পেছনের চাকা ঘেঁষে, ভাজা কলার দোকানের সামনে গড়িয়ে গেল। দোকানি রাগ করল না, ঝুঁকে চপ্পল দিয়ে আস্তে ঠেলে বল বাচ্চার পায়ে ফেরত দিল। পাশ থেকে কেউ চিৎকার করে বলল "অনিয়াঙ্গো", কয়েকজন কিশোর হাসতে হাসতে ছড়িয়ে পড়ল, তারপর আবার বলের পেছনে ছুটল। সেই মুহূর্তে বুঝলাম, উগান্ডায় ফুটবল শুধু খেলা নয়—এ যেন স্ট্রিটের এক সার্বজনীন ভাষা: মাঠ নেই, তবু কিক-অফ সম্ভব; বুট নেই, তবু দৌড়ানো যায়।
কাম্পালা পাহাড়ের ওপর গড়া শহর—উঁচু-নিচু যেন না আঁকা শেষ হওয়া ট্যাকটিক্যাল বোর্ড। দিনে ট্যাক্সি, মিনিবাস, মোটরবাইক আর পথচারী একই সরু রাস্তার জন্য প্রতিযোগিতা করে; রাতে বাজার ধীরে গতি নামিয়ে আনে। ওইনো এলাকার নাইট মার্কেটে বাতির বাল্ব নিচু করে ঝোলানো, বারবিকিউর ধোঁয়া, কয়লার গন্ধ, ভাজা কাসাভার গরম ভাব আর সদ্য বৃষ্টি থামা মাটির গন্ধ—সব মিশে একাকার। এক উগান্ডা জাতীয় দলের জার্সি পরা ছেলে প্লাস্টিকের ব্যাগ বল বানিয়ে দোকানের ফাঁকে বল জাগলিং করছে। প্রতিবার বল ওঠার সঙ্গে আশপাশ থেকে হইহই ওঠে। এই দেশের আশা সবসময় ব্যানারে লেখা থাকে না—বেশিরভাগ সময় সেটা পুরোনো এক ফুটবলের ভেতরেই থাকে।

পরদিন জিনজার দিকে চলেছি, ভিক্টোরিয়া হ্রদের পানি জানালার বাইরে ঝিকমিক করছে। উগান্ডাকে প্রায়ই নীল নদের উৎস দেশ বলা হয়—জিনজার নদীতীরে দাঁড়িয়ে এই বাক্যটা হঠাৎ ভূগোল বইয়ের মতো শোনায় না। পানি ভিক্টোরিয়া হ্রদ থেকে বেরিয়ে আগে শান্ত ভিক্টোরিয়া নীল নদ হয়ে, তারপর উত্তর দিকে—তৃণভূমি, গিরিখাদ আর সীমান্ত পেরিয়ে, শেষে এক মহাদেশের নিয়তি বদলে দেওয়া নদী। বিষুবরেখাও এদেশের শরীরের ওপর দিয়ে আস্তে চলে গেছে, যেন অদৃশ্য এক মধ্যরেখা: দক্ষিণ আর উত্তর গোলার্ধ এখানে হাত মেলায়—হ্রদের পানি, নদী, লাল মাটি আর মানুষের কথা একসঙ্গে সামনে এগোয়।
নদীর ধারে ছোট এক ম্যাচ দেখলাম। গোলপোস্ট দুইটি পাথর, মাঠ অর্ধেক ঘাস, অর্ধেক কাদা। কারও পরনে আর্সেনাল, কারও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, কেউ ফিকে হয়ে যাওয়া উগান্ডা ক্রেনস জার্সিতে। রোগা এক গোলকিপার মাটিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল, হাতের তালু লাল মাটিতে ভরে গেল, উঠে তবু খুব উজ্জ্বল হাসল। ফুটবল এখানে বাস্তবতা থেকে পালানো নয়—বাস্তবতাকে সাময়িকভাবে আরেক সম্ভাবনায় নতুন করে লেখা। তুমি ঠাসা এলাকায় থাকতে পারো, ভালো ট্রেনিং মাঠ নাও থাকতে পারে—কিন্তু বল পায়ের কাছে থাকলে ভবিষ্যৎ এখনো কল্পনা করা যায়।
মার্চিসন ফলস সেই নীরব কল্পনায় হঠাৎ আচড় কাটল। টপ অভ দ্য ফলস-এ গাড়ি পৌঁছানোর আগেই জলের শব্দ বনের ওপাশ থেকে চাপ দিয়ে এলো। সত্যি রেলিং-এর পাশে দাঁড়ালে বোঝা যায় এটা 'গর্জন' দুই শব্দের ব্যাপার না। পুরো নীল নদ সরু পাথরের ফাঁটলে চাপা পড়ে ওপর থেকে আছড়ে পড়ছে—জলের কুয়াশা মুখে এসে লাগছে, যেন কেউ সাদা ঢাকের পর্দা কানের কাছে চেপে বাজাচ্ছে। গাইড বলল, নদী এখানে রাগী হয়ে গেছে—কারণ সরু হতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু আমি সেই উথাল-পাথাল পানির দিকে তাকিয়ে বরং উগান্ডাবাসীর আরেকটি রূপ দেখতে পেলাম: চাপা পড়েছে, কিন্তু সামনে এগোনোর জোর হারায়নি।

আরও দক্ষিণ-পশ্চিমে গেলে রাস্তা পাহাড়ি হতে থাকে। উগান্ডা পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক পর্বত গরিলার আবাস—আর বিন্ডি ইম্পেনিট্রেবল ফরেস্ট (Bwindi Impenetrable Forest) নামটা অত্যুক্তি নয়। এটা সহজে 'হেঁটে ঢোকার' বন নয়—বরং এক ভেজা, ভারী, শ্বাস নেওয়া সবুজ দেওয়াল। সকাল সাতটায় ফরেস্ট রেঞ্জার জমায়েত স্থানে নিয়ম বলছেন: আটজনের দল, গরিলা খুঁজে পেলে এক ঘণ্টার বেশি থাকা যাবে না, ফ্ল্যাশ তোলা যাবে না, নির্দেশ মানতে হবে। প্রতিটি বাক্য সাদামাটা, কিন্তু টুপিতে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সবাই চুপ হয়ে গেল—যেন কোনো পুরোনো আচারের ভেতর ঢুকছে।
বিন্ডির পায়ের শব্দ অন্যরকম। জুতার তলা পথে পড়ার শব্দ নয়—কাদা বুট চুষে ধরে, লতা প্যান্টের পায়ে আটকে, ছুরি গাছের ডাল কাটছে, দূরের পাখি হঠাৎ থেমে যাচ্ছে। আমরা কলাবাগান পেরিয়ে আরও অন্ধকার গাছের ছায়ায় ঢুকলাম। বৃষ্টি অরণ্য পর্যটকের জন্য সমান পথ বানিয়ে রাখেনি—ঢাল পিচ্ছিল, গাছের শেকড় পা আটকানোর ফাঁদ। প্রথমে সবাই কথা বলছিল, পরে শুধু হাঁপানি রইল। ফরেস্ট রেঞ্জার মাঝেমাঝে থামলেন, রেডিওতে ট্র্যাকারের অবস্থান শুনলেন, তারপর আমাদের এগোতে ইশারা করলেন।
প্রায় তিন ঘণ্টা পর সামনের রেঞ্জার হঠাৎ বসে পড়লেন। বাতাস যেন থেমে গেল। কয়েক মিটার দূরে এক রূপালি-পিঠ গরিলা ঝোপের ফাঁকে বসে আছে—কালো লোমে বৃষ্টির ফোঁটা লেগে আছে, পিঠের রুপালি ছোপ ছায়ায় চকচক করছে। সে কোনো অভিনয় করল না, আমাদের স্বাগতও জানাল না—শুধু ধীরে একটা কচি ডাল ভেঙে মুখে পুরল। পাশের ছোট গরিলাগুলো গড়াগড়ি দিচ্ছে, পাতা টানাটানি করছে—কাম্পালার নাইট মার্কেটে বল কেড়ে নেওয়া বাচ্চাদের মতো। কিন্তু রূপালি-পিঠ যখন চোখ তুলল, পুরো বন আবার সঙ্গে সঙ্গে চুপ।

সেই এক ঘণ্টা এক ঘণ্টার মতো কাটেনি। তুমি ক্যামেরা ভুলে যাবে, কাদা ভুলে যাবে, এখানে পৌঁছতে কত কষ্ট হয়েছে তাও ভুলে যাবে। মানুষ বন্যপ্রাণীকে 'দর্শনীয় স্থান' বানাতে অভ্যস্ত—কিন্তু বিন্ডিতে সম্পর্ক উল্টো। গরিলারা আমাদের অনুমতি দিয়েছে—তাদের জীবনের কিনারায় ক্ষণিকের জন্য থেকে যেতে। তারা পাতা খাচ্ছে, ঝিমাচ্ছে, একে অপরের কাছে ঘেঁষছে—আমাদের বিস্ময়ের কোনো দরকার নেই। ফেরার সময় পেছনে তাকিয়ে দেখলাম, রূপালি-পিঠ ঘুরে দাঁড়িয়েছে—এক চলন্ত কালো পাথরের মতো—ধীরে আবার বনের গভীরে ফিরে গেল।
কাম্পালায় ফেরার পথে ভাবছিলাম—ফুটবল আর গরিলার সম্পর্ক কী। একটা লাল মাটির গলির কোণে, আরেকটা উঁচু পাহাড়ের বৃষ্টি অরণ্যে; একটা কোলাহল, দৌড় আর চিৎকারের—আরেকটা নিস্তব্ধতা, দূরত্ব আর সম্ভ্রমের। কিন্তু দুটোই একই কথা বলে: উগান্ডা কীভাবে প্রাণশক্তি ধরে রাখে। ফুটবল আশার ভাষা—বাচ্চারা সেটা দিয়ে বলে, 'আমি এখনো দৌড়াতে পারি'; ইকোলজি সময়ের ভাষা—বিন্ডি সেটা দিয়ে বলে, 'তোমাকে ধীর হতে হবে'।
শেষ রাতে আবার কাম্পালার নাইট মার্কেটে গেলাম। বারবিকিউর দোকানের আগুন খুব জ্বলছে, রেডিওতে ফুটবল ধারাভাষ্য ভেসে আসছে, কয়েকজন লোক ছোট স্ক্রিন ঘিরে রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে তর্ক করছে। দূরে বাচ্চারা তখনো ফুটবল খেলছে—বল অন্ধকারে গড়িয়ে গিয়ে আরেক লাথিতে আবার আলোর নিচে ফিরছে। মনে পড়ল জিনজা থেকে নিঃশব্দে যাত্রা করা নীল নদের কথা, মার্চিসন ফলস জলের শব্দ বুকে ঠেলে দেওয়ার কথা, বিন্ডির বৃষ্টি অরণ্যে রূপালি-পিঠের আস্তে পাতা চিবোনোর কথা।

এভাবেই মনে রাখলাম উগান্ডা ভ্রমণ: এটা আফ্রিকার একমাত্রিক কোনো চিত্রকল্প নয়—শুধু সাফারি, জলপ্রপাত বা গরিলা নয়। এটা স্ট্রিট ফুটবল মাঠ থেকে বৃষ্টি অরণ্যের গভীরে পৌঁছানো এক পথ। আগে কাম্পালায় বাচ্চাদের চিৎকারে আশা শোনো, তারপর নীল নদের ধারে দেখো পানি কীভাবে যাত্রা শুরু করে, শেষে বিন্ডিতে শেখো গলা নিচু করতে। চলে আসার সময় লাল মাটি তখনো জুতার তলায় লেগে ছিল, বৃষ্টি অরণ্যের পায়ের শব্দ তখনো কানে ভাসছিল—আর সেই পুরোনো বলটা যেন তখনো নাইট মার্কেটের বাতির নিচে গড়িয়ে চলেছে।
Discover more countries
Travel stories from other countries
Cape Verde
Trace an archipelago through morna music.
Curacao
Where Caribbean sun meets Dutch gables.
Uzbekistan
Finding modern answers on the Silk Road.
Jordan
Tracing backward from Petra's light.
Haiti
Coming home through a footballer's eyes.
DR Congo
City to river to rainforest to lava.
Iraq
Babylon is still there. Why is no one going?
Qatar
A real receipt for 24 hours in Doha.
Netherlands
Canals, railways, and Oranje match nights.
Switzerland
Reading lakes and mountains by rail.
Morocco
Medinas, Atlantic wind, and Sahara dunes.
South Africa
From Table Mountain to Soweto and Kruger.
Japan
A bullet train arriving exactly on time.
Senegal
Teranga, sea wind, and yellow shirts.
Korea
KTX trains, palaces, and red match nights.
Ivory Coast
Lagoons, cocoa, and orange shirts.
Norway
Fjords, railways, and a north waiting for goals.