🇿🇦 South Africa · Bafana Bafana
দক্ষিণ আফ্রিকা ভ্রমণ: একই সঙ্গে ব্যথা আর উদ্যাপন
রবেন দ্বীপের নীরবতা থেকে সোয়েতোর স্ট্রিট ফুটবল—দেখি বাফানা বাফানা কীভাবে দেশকে আবার এক দল বানিয়ে তুলছে
দক্ষিণ আফ্রিকা ভ্রমণ আসলে শুরু হয়নি বিমানবন্দরে, কিংবা হোটেলের জানালা থেকে টেবল মাউন্টেন প্রথম দেখার মুহূর্তে—শুরু হয়েছিল রবেন দ্বীপের ফেরি আস্তে তীর থেকে দূরে সরে যাওয়ার সময়। কেপ টাউনের সমুদ্র বাতাস খুব শক্ত, যেন এক হাত মানুষের দিকে অতীতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। নৌকার পেছনে ক্রমশ দূরের ভি অ্যান্ড এ ওয়াটারফ্রন্ট তখনো জ্বলছে, টেবল মাউন্টেন শহরের পেছনে নীরবে দাঁড়িয়ে, মেঘ চূড়া থেকে গড়িয়ে নিচে নামছে—যেন সাদা ঝরনা সমতল চূড়া বেয়ে ধীরে নেমে আসছে। গাইড বললেন, স্থানীয়রা এই মেঘকে 'টেবিলক্লথ' বলে ডাকে। আমি ওটাকে শহর ঢেকে ফেলতে দেখলাম, হঠাৎ বুঝলাম: দক্ষিণ আফ্রিকার সৌন্দর্য কখনো ব্যথা ঢেকে রাখার সৌন্দর্য নয়—ব্যথা আর রোদকে একই সঙ্গে থাকতে দেওয়া।
রবেন দ্বীপের সবচেয়ে ভারী জিনিস নীরবতা। ম্যান্ডেলার কারাকক্ষ নাটকীয় নয়—সরু, নিচু, পরিষ্কার, মেঝেতে পাতলা এক মাদুর, কোণায় লোহার বালতি। পর্যটকেরা দরজা দিয়ে লাইন ধরে গেল, সবার পায়ের শব্দ নরম হয়ে গেছে। প্রাক্তন রাজনৈতিক বন্দি গাইড আবেগতাড়িত হলেন না, শুধু খনির জায়গাটা দেখিয়ে বললেন সেখানে অনেকের চোখ সূর্যের আলোয় নষ্ট হয়েছে। ম্যান্ডেলা পরে জেল থেকে বেরিয়ে সাতাশ বছরকে প্রতিশোধ বানাননি—আলোচনার টেবিল বানিয়েছিলেন। এটা শুনতে মহাপুরুষের জীবনীতে থাকা বাক্যের মতো লাগে, কিন্তু সেই ছোট কারাগারের সামনে দাঁড়িয়ে বরং একজনের নিজের জন্য নেওয়া কঠিন সিদ্ধান্ত: আমি ঘৃণাকে আর এই দেশ শাসন করতে দিতে পারি না।

কেপ টাউনে ফিরে বো-কাপের রং মানুষকে ধূসর থেকে হঠাৎ টেনে তোলে। সিগন্যাল হিলের পাদদেশে রাস্তা তেমন ঢালু নয়, কিন্তু বাড়িগুলো একটার পর একটা আরও উজ্জ্বল: পুদিনা সবুজ, গোলাপি, লেবু হলুদ, গাঢ় নীল—যেন কেউ স্বাধীনতা ভেঙে রঙ বানিয়ে বাড়ি বাড়ি মেখে দিয়েছে। এ ছিল কেপ মালয় সম্প্রদায়ের এলাকা, অনেকের পূর্বপুরুষ উপনিবেশিক বাণিজ্যের হাত ধরে কেপ অভ্ গুড হোপে আনা দাস। কেউ বলে, দাসপ্রথা বিলুপ্তির পর বাসিন্দারা নিজেদের বাড়ির মালিক হলো, আর সাদা দেওয়ালে লেপে দিল উজ্জ্বলতম রং। সেটা পর্যটকের ছবি তোলার জন্য নয়—বিশ্বকে জানানোর জন্য: আমার দরজা, আমার জানালা, আমার জীবন—আর অন্যের নিয়মে চলবে না।
কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকা তোমাকে পোস্টকার্ডে আটকে রাখে না। সোয়েতো যাওয়ার পথে জোহানেসবার্গের উঁচু ভবন আস্তে পেছনে সরে গেল, রাস্তার ধারে টিনের ঘর, বারবিকিউর দোকান, গ্যারেজ আর গ্রাফিতি দেওয়াল ফুটে উঠল। ভিলাকাজি স্ট্রিট খুব জমজমাট, ম্যান্ডেলার পুরোনো বাড়ির বাইরে স্মারক বিক্রেতা, দূরের ফাঁকা জায়গায় ধুলোয় বাচ্চারা ফুটবল খেলছে। গোলপোস্ট দুইটা ইট, সাইডলাইন কল্পনায়। এক ছোট ছেলে পুরোনো বাফানা বাফানা জার্সি পরে আছে, পায়ের কাজ দ্রুত, ড্রিবল করে পাশ কাটিয়ে পেছনে তাকিয়ে হাসছে। ওরা এমন খেলছে যেন ট্রেনিং নয়—প্রবৃত্তি: অসম্পূর্ণ জায়গায় শরীরকে আনন্দের হাতে তুলে দেওয়া।
সোয়েতোর আনন্দ হালকা নয়। হেক্টর পিটারসন স্মৃতিকেন্দ্র কাছেই, ১৯৭৬-এর ছাত্র বিদ্রোহের ছবি এখনো কথা বন্ধ করিয়ে দেয়। দক্ষিণ আফ্রিকা এমন এক দেশ—একই সঙ্গে ব্যথা করে আর উদ্যাপন করে, আর ফুটবল তার সবচেয়ে খোলামেলা অভিব্যক্তি। এটা ভান করে না যে ক্ষত নেই, আবার কাউকে সারাক্ষণ ক্ষতের দিকে তাকিয়ে থাকতেও দেয় না। বল গড়াতে শুরু করলে জাতি, ভাষা, আয়, ইতিহাস সব থাকবে—কিন্তু অন্তত নব্বই মিনিট, মানুষ একই দিকে চিৎকার করতে রাজি।

সন্ধ্যায় স্টেলেনবশে পৌঁছে দ্রাক্ষাক্ষেত্র আরেক দক্ষিণ আফ্রিকা মেলে ধরে। উপত্যকায় আলো নরম, ওক কাঠের ব্যারেল, সাদা দেওয়ালের ভিলা, নিখুঁত ছাঁটা দ্রাক্ষালতা—ইউরোপের পুরোনো ছবির মতো সুন্দর। গ্লাসে পিনোতাজ, তামাক আর গাঢ় ফলের স্বাদ, দূরের মাঠে শ্রমিকের দিন শেষ, ছায়া সূর্যাস্তে লম্বা। এই সৌন্দর্য জটিল স্বাদ নিয়ে আসে: উপনিবেশ, জমি, শ্রম, সম্পদ বণ্টন—সব এক বোতলের পেছনে। সূর্যাস্ত খুব কোমল, কিন্তু কোমলতা উত্তর নয়। দক্ষিণ আফ্রিকার সবচেয়ে স্মরণীয় জিনিস—কখনো প্রাকৃতিক দৃশ্য আর ইতিহাস আলাদা করে বেচে না।
সেই রাতে দ্রাক্ষাক্ষেত্রের ঘাসে কেউ আস্তে গান গাইছিল, গ্লাসের কিনারায় শেষ সোনালি আলো লেগে ছিল—যেন পুরোনো ক্ষতকেও একটু নরম করে দিল।
পরদিন ভোরে আবার টেবল মাউন্টেনে উঠলাম, মেঘের জলপ্রপাত পাহাড়ের গা বেয়ে গড়াচ্ছে, শহর, উপসাগর, রবেন দ্বীপ আর দূরের ওয়াইন অঞ্চল—সব এক বিশাল মানচিত্রের মতো চাপা পড়ে আছে। চূড়ায় দাঁড়িয়ে কেপ টাউন দেখলে এক অবাস্তব খোলামেলা অনুভূতি হয়: একদিকে সমুদ্র, আরেকদিকে শহর, আরেকদিকে জেলখানার ধ্বংসাবশেষ, আরেকদিকে রঙিন পাড়া। দক্ষিণ আফ্রিকা ভ্রমণের অসুবিধাও এখানে। শুধু 'চমৎকার' বলা যায় না, কারণ চমৎকারের পাশেই অসাম্য; শুধু 'ভারী' বলাও যায় না, কারণ ভারীতার পাশেই কেউ গাইছে, নাচছে, বারবিকিউ জ্বালাচ্ছে, ডুবন্ত সূর্যের দিকে বল ঠেলে দিচ্ছে।

তাই যখন ২০২৬ বিশ্বকাপে খবর এলো বাফানা বাফানা অপ্রত্যাশিতভাবে ৩২ দলে জায়গা করে নিয়েছে, তাতে আমার একটুও অবাক লাগেনি যে দেশটা আবার বিদ্যুৎ চলে আসার মতো করে ফেটে পড়বে। দক্ষিণ আফ্রিকা ফুটবল একসময় বর্ণবাদে বিশ্ব মঞ্চ থেকে ছিটকে পড়েছিল, অনেক বছর ধরে বারবার চুপ থেকেছে, বিদায় নিয়েছে, অবমূল্যায়িত হয়েছে। কিন্তু সেই রাতে বার, ট্যাক্সি, রেডিও আর সোয়েতোর গলির মুদি দোকান—সব এক নাম চিৎকার করছিল। বাফানা বাফানার পুনর্জীবন শুধু খেলার খবর নয়, অনেক দেরিতে আসা এক জাতীয় বিবৃতি: আমরা এখনো আছি, আমরা অনেক বছর হারতে পারি, কিন্তু চিরকাল অনুপস্থিত থাকব না।
পরে কেপ টাউনের রাস্তায় জাতীয় দলের জার্সি পরা এক ড্রাইভারের সঙ্গে দেখা হলো। সে বলল, ২০১০ বিশ্বকাপ দুনিয়াকে দক্ষিণ আফ্রিকা দেখিয়েছিল, ২০২৬-এর এই ৩২ দলে ওঠা দক্ষিণ আফ্রিকাকে আবার নিজেকে দেখিয়েছে। গাড়ির জানালার বাইরে বো-কাপের রং চোখের পলকে সরে গেল, টেবল মাউন্টেনের মেঘ আবার গড়াতে শুরু করল। সে রেডিওর ভলিউম বাড়াল, ধারাভাষ্যকার জয়সূচক গোল আবার চালাচ্ছে, গলা আবেগে একটু ভেঙে গেছে। আমি পুরোপুরি জুলু আর ইংরেজি মেশানো বাক্য বুঝিনি, কিন্তু সেই হাসি বুঝেছি।
দক্ষিণ আফ্রিকা ছাড়ার সময় মাথায় কোনো নির্দিষ্ট দর্শনীয় স্থান নয়—একে অপরকে টেনে ধরে রাখা কিছু ছবি: রবেন দ্বীপের কারাকক্ষে সহজে না ছাড়া নীরবতা, বো-কাপের দেওয়ালে জোরে কথা বলা রং, সোয়েতোর শিশুদের ধুলোয় বল ধাওয়া করার পা, স্টেলেনবশের সূর্যাস্তে অর্ধ-শেষ গ্লাস, আর টেবল মাউন্টেনের মেঘ-জলপ্রপাত আস্তে আস্তে শহর ঢেকে ফেলার দৃশ্য। দক্ষিণ আফ্রিকা সহজ গন্তব্য নয়, কিন্তু গভীর করে দিয়ে যায়। এটি পর্যটককে একটা জিনিস শেখায়: পুনর্মিলনী মানে অতীত ভুলে যাওয়া নয়—অতীত মনে রেখেও পাশের জনকে বল পাস দিতে রাজি থাকা।
Discover more countries
Travel stories from other countries
Cape Verde
Trace an archipelago through morna music.
Curacao
Where Caribbean sun meets Dutch gables.
Uzbekistan
Finding modern answers on the Silk Road.
Jordan
Tracing backward from Petra's light.
Haiti
Coming home through a footballer's eyes.
DR Congo
City to river to rainforest to lava.
Iraq
Babylon is still there. Why is no one going?
Qatar
A real receipt for 24 hours in Doha.
Netherlands
Canals, railways, and Oranje match nights.
Switzerland
Reading lakes and mountains by rail.
Morocco
Medinas, Atlantic wind, and Sahara dunes.
Japan
A bullet train arriving exactly on time.
Senegal
Teranga, sea wind, and yellow shirts.
Korea
KTX trains, palaces, and red match nights.
Ivory Coast
Lagoons, cocoa, and orange shirts.
Norway
Fjords, railways, and a north waiting for goals.
Uganda
The Nile, gorillas, and The Cranes.